নিজস্ব প্রতিবেদক

মঙ্গলবার , ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চাইছিলেন বিচারপতি সিনহা: আইনমন্ত্রী

বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, শৃঙ্খলা বিধির নামে তা সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি নিয়ে সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল বিচারপতি সিনহার। আইন মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা খসড়াটি ফেরত পাঠিয়েছিলেন তিনি।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে চাপের মধ্যে বিচারপতি সিনহা পদত্যাগ করার পর ওই শৃঙ্খলা বিধির গেজেট প্রকাশ হয়।

গত ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার গেজেট প্রকাশের পর এমন প্রতিক্রিয়াও এসেছে যে এর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন করে ফেলা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সরকারি আইনজীবীদের ১৯তম প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই প্রসঙ্গটি তোলেন আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে যা বলা আছে, সেই আকারে (গেজিট) করা হয়েছে। মাসদার হোসেনের মামলায় ১২টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ১২টি নির্দেশনার ৭ নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, একটি রুলস প্রণয়ন করার। সেই রুলসে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার কথা বলা হয়েছিল।

“এই শৃঙ্খলাবিধির ২৯ (২) এ বলা হয়েছে, যদি কোনো দ্বিমত হয় এবং সেটা যদি নিরসন না হয় তাহলে সুপ্রিম কোর্টের শেষ পরামর্শ যেটা সেটাই প্রাধান্য পাবে। সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো মতেই ক্ষুন্ন হয়নি।”

বিচারপতি সিনহা এই প্রজ্ঞাপনের খসড়াটি ফেরত পাঠানোর পর ৩১ জুলাই এক অনুষ্ঠানেও আনিসুল হক বলেছিলেন, “তারা (সুপ্রিম কোর্ট) সংশোধন করে যেটা দিয়েছিল, সেখানে দেখা গেছে… আমার কাছে ডকুমেন্ট আছে… ১১৬ অনুচ্ছেদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমতা, সেটা তারা নিয়ে নিতে চায়। আমি কী করে সেটা দিই?”

যে মামলার রায়ে বিচার বিভাগ আলাদা হয়েছে, সেই মাসদার হোসেন মামলার প্রসঙ্গ টেনে সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, “ওই মামলায় বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ করার সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশ ছিল, এটি তার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।”

“এর মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকগণ সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল। এখন আর বলা যাবে না যে, বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক একটি প্রতিষ্ঠান।”

এটি মাসদার হোসেন মামলায় দেওয়া নির্দেশনার পরিপন্থি বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামও।  

আইনমন্ত্রী এই শৃঙ্খলা বিধি প্রণয়নের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, মাসদার হোসেন মামলার পরে এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের আলোকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য একটি শৃঙ্খলা বিধি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের আগে তা তৈরি করা হয়নি। আইন মন্ত্রণালয় তা তৈরি করার পর এটা তার কাছে আসে।

“যেহেতু সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে হাই কোর্টের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা আছে এবং ১১৬ তে মাহামান্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ গ্রহণের কথা বলা আছে, সেক্ষেত্রে আমি মনে করেছি, এটা সুপ্রিম কোর্টের কাছে পাঠানো উচিৎ।

বিচারপতি সিনহার দেওয়া আদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য ছিল দাবি করে আইনমন্ত্রী বলেন, “সেখানে পরিষ্কারভাবে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য ছিল। ১১৬ অনুচ্ছেদে যে ক্ষমতা দেওয়া ছিল মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে সেই ক্ষমতাটা এই শৃঙ্খলাবিধির মাধ্যমে নিয়ে নেওয়ার একটা চেষ্টা ছিল। তখন আমরা সেটাতে বাধা দিলাম। বললাম, এটা তো সংবিধানের লঙ্ঘন। ফলে আমরা ড্রাফটটা ফেরৎ পাঠাই।

“যখন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। সেখানে ১১৬’র সঙ্গে যেসব সাংঘর্ষিক ছিল আমরা সকলে একমত হয়ে তা পরিহার করেছি। পরবর্তীতে এই রুলস ঐক্যমতে প্রণয়ন করে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছি। রাষ্ট্রপতি সেটা দেখে, সবরকম আইন পালন করা হয়েছে সুনিশ্চিত হয়ে তিনি সেটা গেজেট করার জন্য আদেশ দিলেন।”

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ নাকচ করে আনিসুল হক বলেন, “আমাদের মতো বিচার বিভাগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর কোনো সরকার হয়নি।”

সরকারি আইনজীবীদের এই বার্তা জনগণের কাছে পৌছে দেওয়ার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী।


সর্বশেষ সংবাদ