২০২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স।
দক্ষিণ মেরুর শত শত মিটার বরফের নিচে এমন এক বিশাল ফাঁদ পেতে সুদূর মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছেন এই বিজ্ঞানী। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় ও লাজুক কণার নাম নিউট্রিনো। এ কণার কোনো চার্জ নেই, ভরও প্রায় শূন্যের কোঠায়। অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে এর মেলামেশা বা মিথস্ক্রিয়া নেই বললেই চলে।
প্রতি সেকেন্ডে আপনার আঙুলের ডগার ওপর দিয়ে সূর্য থেকে আসা ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো চলে যাচ্ছে, অথচ আপনি কিছুই টের পাচ্ছেন না। কিন্তু এই অধরা কণাই যখন সুদূর কোনো গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে হাজার কোটি মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে আসে, তখন তা সাথে নিয়ে আসে মহাবিশ্বের সবচেয়ে গোপন কিছু রহস্যের বার্তা। আর সেই অধরা ও রহস্যময় কণা শনাক্ত করে সেই বার্তা পাঠোদ্ধার করার উপায় আবিষ্কার করেছেন ফ্রান্সিস হালজেন।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বেলজিয়ামে বেড়ে ওঠা ফ্রান্সিস হালজেন কণা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হন। পিএইচডি শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে যোগ দেন। মহাজাগতিক রশ্মির অতি উচ্চ-শক্তির প্রোটন কণাগুলো কীভাবে তৈরি হয় এবং কোথা থেকে আসে, তা বহুকাল ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য ছিল। মহাশূন্যের তীব্র চুম্বকক্ষেত্রের কারণে প্রোটনের গতিপথ বেঁকে যায়। ফলে সেগুলো সরাসরি কোথায় তৈরি হয়েছে তা জানা সম্ভব হয় না।
কিন্তু মহাজাগতিক কণা ত্বরকগুলোতে প্রোটন ত্বরান্বিত হওয়ার সময় তৈরি হয় নিউট্রিনো ও গামা রশ্মি। গামা রশ্মি মহাজাগতিক ধূলিকণায় আটকে যেতে পারে বা শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু নিউট্রিনোকে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি মহাবিশ্বের কোনো কিছুরই নেই। তাই উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর গতিপথ অনুসরণ করতে পারলে মহাবিশ্বের চরম সহিংস ঘটনাগুলোর (যেমন: সক্রিয় গ্যালাক্সি বা বিস্ফোরিত নক্ষত্র) উৎসে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব।
আশির দশকে হালজেন বুঝতে পারেন, মহাজাগতিক নিউট্রিনো ধরার সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হতে পারে দক্ষিণ মেরুর অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর। কারণ সমুদ্রের পানির চেয়ে গভীর বরফ অনেক বেশি স্বচ্ছ ও স্থির। কিন্তু সেখানে চ্যালেঞ্জ ছিল প্রচণ্ড—হিমশীতল অ্যান্টার্কটিকায় মাইলের পর মাইল বরফ গলিয়ে গর্ত করা এবং সেখানে সংবেদনশীল আলো শনাক্তকারী সেন্সর বসানো। উষ্ণ পানি দিয়ে বরফ গলিয়ে গর্ত তৈরি করে বিশেষ কেবল ও অপটিক্যাল মডিউল (আলোক সেন্সর) বরফের গভীরে নামিয়ে দেওয়া হয়।
একটি মহাজাগতিক নিউট্রিনো যখন অতি দুর্লভভাবে বরফের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, তখন চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয় এবং বরফের ভেতরে নীল আলোর এক সূক্ষ্ম ঝলকানি ছড়ায়। বরফের ভেতরের সেই আলোর দিশা দেখেই সেন্সরগুলো নিউট্রিনোর দিক ও শক্তি মেপে নেয়।
প্রথমে অ্যামান্ডা প্রকল্পের মাধ্যমে এর পরীক্ষা শুরু হয়। তবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে আরও বড় পরিসরে কাজ শুরুর পর। তৈরি হয় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি । বরফের গভীরে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১,৪৫০ থেকে ২,৪৫০ মিটার গভীরে ৮৬টি কেবলে মোট ৫,১৬০টি আলোক সেন্সর স্থাপন করা হয়। ২০১১ সালে আইসকিউব সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয় এবং ২০১৩ সালের মধ্যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে তারা সত্যি সত্যিই সৌরজগতের বাইরের গভীর মহাবিশ্ব থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পেরেছেন।
আইসকিউবের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে এবং দূরের সক্রিয় গ্যালাক্সি (যেমন NGC 1068) থেকে আসা নিউট্রিনোর সন্ধান পেয়েছেন। প্রথাগত আলো বা টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বের যেসব অন্ধকার ও ধূলিধূসরিত অঞ্চল দেখা অসম্ভব ছিল, নিউট্রিনো এখন সেসব অঞ্চলের নতুন বার্তা বয়ে আনছে।
ফ্রান্সিস হালজেনের প্রবর্তিত এই পথ ধরে এখন বিশ্বজুড়ে কাজ চলছে। বৈকাল হ্রদ, ভূমধ্যসাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগরে পানির নিচেও নতুন নিউট্রিনো টেলিস্কোপ তৈরি হচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ মেরুতে আইসকিউবকে আরও বড় করে দ্বিতীয় প্রজন্মের আইসকিউব তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এর আয়তন হবে প্রায় ৮ ঘনকিলোমিটার।
মহাবিশ্বে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলোর আলো হয়তো আমাদের কাছে পৌঁছায় না। কোনো কোনো বার্তা ধুলায় আটকে যায়, কোনোটি পথে শক্তি হারায়, কোনোটি মহাকাশের চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে তার উৎসের ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু নিউট্রিনো এসব বাধার তোয়াক্কা করে না। সে ছুটে আসে প্রায় অপ্রতিরোধ্যভাবে, কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো ভয়ংকর মহাজাগতিক ঘটনার খবর বুকে নিয়ে।
তারপর পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর গভীর বরফে কোনো এক মুহূর্তে একটি নিউট্রিনো পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। তৈরি হয় ক্ষীণ নীল আলোর ঝলক। বরফের অন্ধকারে সেই ক্ষুদ্র আলো ধরে ফেলে আইসকিউবের একটি সেন্সর। সেই এক ঝলক আলোতেই লুকিয়ে থাকতে পারে মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছরের পুরোনো কোনো রহস্যের উত্তর।
২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার আসলে সেই ক্ষীণ আলোর ঝলকটিকেই সম্মান জানাল। সেই সঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দিল, মহাবিশ্বকে জানতে সব সময় আকাশের দিকে তাকাতে হয় না। কখনো কখনো তার সবচেয়ে গভীর রহস্য লুকিয়ে থাকে আমাদের পায়ের নিচে, কয়েক কিলোমিটার বরফের অন্ধকারে।
আগামী ৭ অক্টোবর, বুধবার বাংলাদেশ সময়ে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের নাম জানা যাবে। ইতিমধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিন বিজ্ঞানী পেয়েছেন এ বারের নোবেল পুরস্কার।
প্রত্যেক বিভাগের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা পাবেন একটি নোবেল মেডেল, একটি সনদপত্র এবং মোট ১২ মিলিয়ন বা ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ২০২৬ সালে তা বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পুরস্কারে ১০ লাখ ক্রোনা বা প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হানা স্টিয়ারনে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কারের ১২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে এই অর্থ বাড়ানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ মিলিয়ন ক্রোনা থেকে বাড়িয়ে ১১ মিলিয়ন করা হয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এতে আর কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০২৬ সালে আবার ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বাড়ানো হলো।
যেসব বিভাগে একাধিক নোবেলজয়ী থাকবেন, তাঁদের মধ্যে এই ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা ভাগ হয়ে যাবে। বর্তমান বাজারে এর মান প্রায় ১২ লাখ ৮ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় হবে প্রায় ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি!