তারিকুল ইসলাম, প্রতিনিধি :বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেনদিয়ার জাহিদ হাসান মিলনায়তনে আজ অনুষ্ঠিত হলো বরেণ্য চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মুক্তিযোদ্ধা সরদার ফজলুল করিমের জন্মশতবার্ষিকী। আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট লেখক, চিন্তক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। অনুষ্ঠান শুরু ও শেষ হয় বাঁশির সুরে, আর মাঝখানে ছিল গভীর স্মৃতিচারণ, কবিতা, গান এবং পাঠ।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘আগুনের পরশমণি’ গান পরিবেশনার মাধ্যমে। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি সরদার করিমের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা তুলে ধরে বলেন, "নারীমুক্তি নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল দূরদর্শী ও সাহসিকতাপূর্ণ।"
বিজ্ঞান লেখক ও চিন্তক সুব্রত বড়ুয়া বলেন, “তিনি ৭৬-এর মনান্তর, ৪৭-এর দেশভাগ, ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং ছিলেন সম্মুখ মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর চিন্তার গভীরতা আমাদের শিখিয়েছে কেমন করে যুক্তির আলোয় সমাজ দেখতে হয়।”
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন ফাতেমা ফারজানা নির্জনা। কবিতার ভাবনা যেন মিলেমিশে যায় সরদার করিমের মানবতাবাদী দর্শনের সঙ্গে।
প্রকাশক মো. জসিম উদ্দিন স্মরণ করেন, “তিনি ছিলেন আমাদের প্রকাশনার অনেক বইয়ের প্রেরণা। খুব সরলভাবে সত্য কথা বলতেন, কাউকে আঘাত না করেই।”
লেখক ও সম্পাদক আনিসুর রহমান বলেন, “তাঁর লেখা এক চিঠি আমার সম্পাদক জীবনের দিশারি হয়েছিল। তিনি ছিলেন সত্যিকারের আলোকবর্তিকা।”
সমাজকর্মী সুব্রত ভট্টাচার্য বলেন, “তিনি শুধু লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, সমাজ গঠনের প্রয়াসে ছিলেন নিবেদিত।”
অধ্যাপক এম এ আজিজ মিয়া স্মরণ করে বলেন, “আজিজ সুপার মার্কেটে আমাদের প্রায়ই দেখা হতো। দেখা হলেই তিনি অধ্যাপক এম এম আকাশকে খুঁজতেন। তিনি ভাবনার মধ্যেই বাস করতেন—কোনো চিন্তা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতেও পারতেন না।”
তারাপদ রায়ের ‘দারিদ্র্য রেখা’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন মাকসুদ খান সোহান। কবিতাটি সরদার করিমের দরিদ্রবান্ধব সমাজ ভাবনার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে।
লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক মশিউল আলম বলেন, “চিন্তা ও প্রকাশের গভীরতা কীভাবে হাত ধরাধরি করে চলে, তা আমি শিখেছি তাঁর কাছে।”
অনন্যা গোস্বামী পাঠ করেন সরদার করিমের লেখা ‘হতাশা থেকে হতাশার মহামারী হয়’ (গ্রন্থ: জীবন জয়ী হবে, শান্তনু মজুমদার)। তাঁর দার্শনিক বিশ্লেষণ শ্রোতাদের বিমুগ্ধ করে।
সমাজচিন্তক কাজী মো. শীষ বলেন, “তর্ক হোক বা প্রতিবাদ—তিনি সবসময় বিবেকের পক্ষে দাঁড়াতেন।”
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি, অধ্যাপক বদিউর রহমান বলেন, “তিনি ছিলেন শুধুই চিন্তাবিদ নন, একজন সাংস্কৃতিক সংগঠকও। উদীচীর একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সহযাত্রা ছিল চিরস্মরণীয়।”
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, “১৯৯৮ সালে তাঁর ডায়েরিতে লেখা আছে—‘তোমার পায়েস খেয়ে দুটি বছর আয়ু বেড়ে গেল।’ এটি শুধু খাবারের প্রশংসা নয়, সম্পর্কের আন্তরিকতার স্মারক। তাঁর বিশ্লেষণ আজও আমাদের পথ দেখায়।”
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডা. শাকিল আখতার, সরদার ফজলুল করিম স্মৃতি পরিষদের পক্ষে। তিনি জানান, জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মনীষী সরদার ফজলুল করিম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা, ওয়েবসাইট চালু ও রচনাসমূহ সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রতিটি বক্তব্যেই সরদার ফজলুল করিমের প্রজ্ঞা, বিনয়, জীবনদর্শন ও মনীষার আলো ছড়িয়ে পড়ে। বাঁশির সুরে শেষ হয় শতবর্ষের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি, যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিন্তাশীল প্রজন্মের জন্য।