২২ মে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য "প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য এবং টেকসই উন্নয়ন"। পৃথিবীর প্রাণ ও প্রকৃতিকে ঘিরে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই জাতিসংঘ ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছর এ দিনটিকে জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১৯৯২ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের দিনটি স্মরণে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর সূচনা হয়েছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ধরিত্রী সম্মেলনে, যেখানে প্রথমবারের মতো জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জীববৈচিত্র্য কেবল প্রাণ ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্যই নয়, এটি আমাদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। এটি একটি দেশ বা অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। অথচ আজ এই অমূল্য সম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে। বন উজাড়, নদী ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, বালু উত্তোলন, বৃক্ষ নিধন, বন্য প্রাণী শিকার এই প্রতিটি কার্যক্রমই জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অনুঘটক।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির সম্মুখীন। এই ক্ষতির একটি বড় অংশই মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী। পরিবেশবিদদের মতে, বন ধ্বংসের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়ছে এবং পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে বিরাট ধস নামছে।
বাংলাদেশ একসময় ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। কিন্তু দিন দিন এখানেও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১০৮টি প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির পথে, ৩৩ প্রজাতির পাখি,২১ প্রজাতির মাছ, এবং ২১ প্রজাতির বৃক্ষ এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
দেশের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৫.৫৮%, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনেক কম। অবৈধভাবে গাছ কাটা, চারাগাছ রোপণে অবহেলা, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এবং পাহাড়-নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের মতো কার্যকলাপ এই সংকটকে আরও তীব্রতর করছে।
একসময় বাংলাদেশের বুক চিরে প্রবাহিত হতো দেড় হাজারের বেশি নদী। বর্তমানে বাংলাদেশের নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার ২৯৪টি। এ নদ-নদীগুলোর উপনদী ও শাখানদী রয়েছে। এখন রুগ্ন অবস্থায় রয়েছে ১৫৮টি নদী, ১৭টি নদী মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। নদীমাতৃক এই দেশে নদীর মৃত্যু মানে প্রাণের মৃত্যু। নদীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নানা প্রজাতির জীব ও উদ্ভিদ আজ চরম বিপন্ন।
আমাদের পৃথিবী একটি পরস্পরনির্ভরশীল জীবমণ্ডল। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। একটির বিনাশ অন্যটির অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তোলে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর ২০টি দেশের কার্বন নির্গমন বিশ্ব উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ওপর। বিশ্বব্যাংকের ‘গ্রাউন্ডসওয়েল’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটতে পারে ৪ কোটির বেশি মানুষের যার প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশের।
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে জীববৈচিত্র্য, বন, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, বাস্তবতা তার উল্টো চিত্রই তুলে ধরে। সুন্দরবনসহ পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশেরই নয়, বিশ্ববাসীর সম্পদ। তাই তার সুরক্ষায় সরকার, প্রশাসন ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
জীববৈচিত্র্য ধ্বংস কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়—এটি বৈশ্বিক সংকট। উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব হলো একসঙ্গে কাজ করা, যাতে করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়।
বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনকে উৎসাহিত করা, বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণে অংশগ্রহণ করা এবং নদী, বন ও প্রাণীদের বাসস্থান রক্ষায় সোচ্চার হওয়া। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাই আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ।
প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে সব—জীবন, খাদ্য, পানি, নিঃশ্বাস। এখন সময় প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার। তাই আসুন, বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি—প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানের। এই পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাড়ি, একে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের সচেতনতা, সংবেদনশীলতা ও দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক :মোঃ. হুমায়ুন কবির সুমন, পরিবেশ কর্মী,গ্রীন ভয়েস। [email protected]