ফরমান শেখ, ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে আধুনিক কৃষিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায়। সেখানে ‘পলিসেড হাউস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগাম শীতকালীন হাইব্রিড সবজির চারা উৎপাদনে সাফল্য পাচ্ছেন কৃষকরা। এই প্রযুক্তিতে শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, বেগুন, টমেটোসহ নানা জাতের সবজির সুস্থ ও সবল চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে চরাঞ্চলসহ প্রতিকূল এলাকায় কৃষির নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’— এর আওতায় সদর উপজেলার হুগড়া ইউনিয়নের মালতীপাড়া গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম তার ৫ শতাংশ জমিতে একটি পলিসেড হাউস স্থাপন করেছেন। সেখানেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ ও মানসম্মত চারা উৎপাদন করছেন তিনি।
পলিথিন, লোহা ও বাঁশের কাঠামোতে তৈরি এই বিশেষ শেড চারাগাছকে অতিবৃষ্টি, প্রচণ্ড রোদ, তীব্র ঠান্ডা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চারার জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। ফলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় চারার রোগ-বালাই কম হয় এবং গুণগতমান ও সফলতার হার অনেক বেশি থাকে।
এ পদ্ধতিতে মাটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নারিকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি প্রাকৃতিক তন্তু ‘কোকোপিট’। এটি দীর্ঘ সময় আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং চারার শিকড়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলে সহায়তা করে। ফলে শিকড় পচনসহ নানা রোগের ঝুঁকি কমে যায় এবং চারা হয়ে ওঠে সুস্থ ও সবল।
বর্তমানে এই পলিসেড হাউসে আগাম শীতকালীন শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। মৌসুম শুরুর আগেই চারা উৎপাদন করতে পারায় কৃষকরা বাজারে আগাম চারা সরবরাহ করতে পারছেন। চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দামে চারা বিক্রি করে বাড়তি লাভও পাচ্ছেন চাষিরা।
কৃষক আরিফুল ইসলাম জানান, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ৫ শতক জমিতে পলিসেড হাউস স্থাপন করার পর তিনি শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদনে ভালো সাফল্য পেয়েছেন। তার ভাষায়, প্রতিটি চারা উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৭০ পয়সা, আর পাইকারি ও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে আড়াই টাকা দরে। ফলে খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ থাকছে তার। পলিসেড হাউসে চারা উৎপাদন তার কৃষি জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।
অপরদিকে কৃষক আরিফুল ইসলামের এই সাফল্য দেখে স্থানীয় অন্যান্য কৃষকরাও এখন পলিসেড হাউস প্রযুক্তিতে চারা উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তাদের মতে, আগাম শীতকালীন সবজির চারা হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা ও দাম দুটোই তুলনামূলক বেশি। ফলে চরাঞ্চলের কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি মালতীপাড়ার পলিসেড হাউসে চারা উৎপাদন, এলএলপি (LLP)-এর মাধ্যমে সেচ এবং ভার্মিকম্পোস্ট প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিচালক মো. শাহেদুর রহমান, টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (উদ্যান) মো: শোয়েব মাহমুদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কৃষি অফিসার রুমানা আক্তার ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কৃষি অফিসার রুমানা আক্তার বলেন, পলিসেড হাউস উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও নিরাপদ সবজির চারা উৎপাদনের একটি আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তি। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও এ পদ্ধতিতে আগাম চারা উৎপাদন করা যায়, ফলে কৃষকরা বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন। এই প্রযুক্তি যমুনা ও ধলেশ্বরীর চরাঞ্চলের কৃষিতে টেকসই পরিবর্তন আনছে এবং কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে কৃষিকে আরও লাভজনক ও টেকসই করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। পলিসেড হাউসের মাধ্যমে প্রতিকূল আবহাওয়া ও মৌসুমি ঝুঁকি মোকাবিলা করে মানসম্মত চারা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকরা আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করে ভালো দাম পাচ্ছেন, যা চরাঞ্চলের কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও কৃষির বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।