রূপগঞ্জে বিষাক্ত গ্যাসের নরকযন্ত্রণা ৭ গ্রাম যখন ধুঁকছে তখন ঢুকলো চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫১ টন ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : মঙ্গলবার , ০৬ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ নুর আলম,রূপগঞ্জ : বসতবাড়ির পাশে বিষাক্ত গ্যাসের তীব্র ঝাঁজালো গন্ধ। রাতে ঘুম ভাংলেই বুক জ্বালাপোড়া আর শ্বাসকষ্ট। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকার ওয়াটা কেমিক্যাল কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় দিশেহারা পার্শ্ববর্তী ৭টি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। বিষাক্ত গ্যাসে একদিকে অসুস্থ হচ্ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা, অন্যদিকে মারা যাচ্ছে গবাদি পশু ও পুকুরের মাছ, নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। অথচ জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা এই বিতর্কিত কারখানাতেই শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের জন্য আনা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ বছর ধরে পড়ে থাকা প্রায় ১৫১ টন বিপজ্জনক ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পদার্থ।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় দেড় দশক ধরে রাতে লোকজনের অজান্তে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে আসছে কারখানাটি। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে মঙ্গলখালী, কাটাখালী, মোকিব নগর, পাবই, ঠাঁকুরবাড়ীরটেক ও বানিয়াদি এলাকায় ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধি। ২০১৭, ২০১৯, ২০২০ এবং ২০২২ সালে একাধিকবার কারখানার গ্যাস লাইন লিকেজ হয়ে শিশু-নারীসহ অর্ধশতাধিক মানুষ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কারখানাটি ঘনবসতি এলাকা থেকে সরানোর দাবিতে এলাকাবাসী বারবার বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দিলেও মেলেনি সমাধান। উল্টো প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের দেয়া দুই কোটি টাকার মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় ৫ জন বাসিন্দা।

 

স্থানীয় বাসিন্দা জামান মিয়া বলেন, প্রায়ই কারখানাটি থেকে গ্যাস ছাড়ার পর বুক জ্বালাপোড়া করে, মাথাব্যথা করে ও শ্বাসকষ্ট হয়। গ্যাসের কারণে আশেপাশের পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

 

মঙ্গলখালী এলাকার বাসিন্দা সুলতানা বেগম বলেন, ওয়াটা ক্যামিকেলের গ্যাসে প্রায়ই এলাকাবাসী অসুস্থ হয়ে পড়ে।জমির ফসলসহ গাছপালা মরে যায়। প্রতিবাদ করলে মালিকপক্ষের লোকজন নানা ভাবে হুমকি দেয়।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, বিষাক্ত গ্যাসের ব্যপারে প্রতিবাদ করায় কয়েক বছর আগে তাকেসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকার একটি চাঁদাবাজি মামলা দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ কারণে এখন তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।

 

এদিকে এসব অভিযোগ থাকার পরেও ১৫০ দশমিক ৮৯ টন মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী বিপজ্জনক রাসায়নিক বহনকারী নয়টি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যালসে পাঠানো হয়েছে। সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, মিথানল ও থিনারসহ এসব রাসায়নিক প্রায় দুই যুগ ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে ছিল।

 

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস সূত্র জানায়, বন্দরের নিরাপত্তা জোরদার এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনারের কারণে সৃষ্ট জট কমাতে গত ৩ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে এসব কনটেইনার সরানোর কার্যক্রম শুরু হয়। নয়টি কনটেইনারে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।

 

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল অথরিটি ফর কেমিক্যাল উইপনস কনভেনশন এর সুপারিশের ভিত্তিতে নিরাপদে ধ্বংস করার জন্য এসব বিপজ্জনক রাসায়নিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নয়টি কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কনটেইনার জট কমানোর লক্ষ্যে। কাস্টমসের ধ্বংস কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে পুলিশি পাহারায় কনটেইনারগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে পাঠানো হয়। মুড়াপাড়ায় ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেড পরিবেশবান্ধব ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় এসব রাসায়নিক ধ্বংস করবে। এই কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আনসার ব্যাটালিয়ন সহযোগিতা করছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে অগ্নিঝুঁকি কমানো, রাসায়নিক দূষণের আশঙ্কা দূর করা এবং দীর্ঘদিনের কনটেইনার জট নিরসনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই বিশেষ অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেছে। বিভিন্ন কারণে আমদানির পর এসব রাসায়নিক খালাস করা হয়নি। কিছু চালানের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতাও দীর্ঘদিন ধরে কনটেইনারগুলো বন্দরে পড়ে থাকার অন্যতম কারণ।

 

বন্দর সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মোট ২৯টি রাসায়নিকবাহী কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে রয়েছে। বিপজ্জনক এসব রাসায়নিক দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় তা বন্দর নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে শনিবার প্রথম দফায় নয়টি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

 

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জে নেওয়ার সময় বিপজ্জনক রাসায়নিক বহনকারী একটি কাভার্ডভ্যানে গত ৪ অক্টোবর সকালে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে আগুনে গাড়িতে থাকা রাসায়নিকের ড্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ ঘটনায় কেউ হতাহতও হননি। পরে ক্ষতিগ্রস্ত কাভার্ডভ্যানটিকে কাঁচপুর হাইওয়ে থানায় রাখা হয়েছে।

 

রাসায়নিক ধ্বংসের কার্যক্রম তদারকিতে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব রাসেল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, মোট ছয়টি কনটেইনার ও তিনটি কাভার্ডভ্যানে করে এসব মালামাল চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে নেওয়া হচ্ছিল। আগুন লাগা কাভার্ডভ্যানটিতে থাকা ড্রামগুলো বর্তমানে খালি ছিল। অতীতে এসব ড্রামে রাসায়নিক সংরক্ষণ করা হলেও নিরাপদভাবে ধ্বংসের জন্য সেগুলোও নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হচ্ছিল।

 

কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুয়েল মিয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কাভার্ডভ্যানের ইঞ্জিন থেকেই আগুনের সূত্রপাত। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। গাড়িতে থাকা রাসায়নিকের ড্রামগুলোতে আগুন ছড়ায়নি। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কাভার্ডভ্যানটি বর্তমানে কাঁচপুর থানায় রাখা হয়েছে।

 

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছয়টি কনটেইনার ও তিনটি কাভার্ডভ্যানের মধ্যে একটি কাভার্ডভ্যান বাদে বাকী সবগুলোই ইতোমধ্যে রূপগঞ্জের ওয়াটা ক্যামিক্যাল কারখানায় পৌছে। যার মধ্যে সোমবার বিকেল অবধি  আনলোড হয়েছে ৫ টি কন্টেইনার। এর মধ্যে অধিকাংশ কন্টেইনারে ছিল ভাঙ্গাচুড়া প্লাস্টিকের গ্যালন ও লোহার ড্রাম।  মালামাল আনলোড করা হলে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের উপস্থিতিতে ধ্বংস করার কথা জানান চট্রগ্রামের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) সোহেল আহমেদ।

 

ওয়াটা ক্যামিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার  (ডিজিএম) বাবলু দাস বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সরকারী অনুমোদন নেই। তবে পরিত্যক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ধ্বংস করার পুর্ব অভিজ্ঞতা আছে। এছাড়াও কারখানায় রাসায়নিক বর্জ্য ধ্বংস করার জন্য ইটিপি প্ল্যান্ট সহ প্রয়োজনীয়  সকল ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এতে স্থানীয় এলাকার মানুষের স্বাস্থ ঝুঁকির কোন কারন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের গ্যাসে কারো কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিছু মহলের প্ররোচনা ও স্বার্থান্বেসী মহল সুবিধা নিতে এসব করে থাকে। আমাদের এখানে সালফিউরিক এসিডসহ বিভিন্ন ধরনের এসিড তৈরি করা হয়। এতে কারো কোন ক্ষতি হয়না।

 

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক এএইচ এম রাশেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর যেসব শর্ত দিয়েছিল সেসব শর্ত মেনেই ওয়াটা কেমিক্যালসে রাসায়নিকগুলো ধ্বংসের জন্য আনা হয়েছে। এর আগেও যখন ওয়াটা কেমিক্যালসে যখন কেমিক্যালস ধ্বংস করা হয়েছিল তখন আমাদের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। যদি এবারো আমাদের কমিটিতে রাখা হয় তাহলে ধ্বংসের সময় আমাদের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবে।    

 

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ মামুন শফি বলেন,উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এখানে ইটিপি তারা ভিসিট করে তারপর এই ওয়াটা কেমিক্যালসে বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের অনুমতি দিয়েছে। এখনো এগুলো ধ্বংসের দিন তারিখ নির্ধারণ হয়নি।


আর্কাইভ