করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলো। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ, ত্রাণ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে তহবিল বিতরণ করেছে। অপরদিকে বহুজাতিক ব্যাংকগুলো ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করলেও সিএসআর খাতে তাদের ব্যয় ছিল সবচেয়ে কম। স্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলো দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো এই তালিকায় রয়েছে তৃতীয় স্থানে। আর সবার শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে এসব দেখা গেছে।
উক্ত খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বিদেশি ব্যাংকগুলোকে বলা, তারা যেন সিএসআর বাড়ায়। কেননা তাদের বার্ষিক মুনাফা অনেক বেশি। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলো বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য তুলে ধরে ধরছে, তাতে এমনটা বুঝায় না যে, তাদের সামাজিক বা পরিবেশগত দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে। তারা বেশি খরচ করার চেয়ে প্রকৃত প্রভাবের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনÑ এই ছয় মাসে দেশের সব ব্যাংক মিলে সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে মাত্র ১৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অথচ এর আগের ছয় মাসেই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩০৭ কোটি টাকা। অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়া এই ব্যয় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ব্যাংক খাতের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও এর ব্যবহার নিয়ে।
সিএসআর মানে হলো, ব্যাংকগুলোর মুনাফার কিছু অংশ এমন কাজে ব্যবহার করা, যা দেশের প্রধান প্রধান সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। যেমনÑ দারিদ্র্য হ্রাস, পরিবেশ রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন ইত্যাদি। এটি অর্থদানকে কাঠামোবদ্ধ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর বিষয়ক গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে সামাজিক ব্যয় করতে উৎসাহিত করা হয়, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়। এ ছাড়া এর জন্য কোনো ন্যূনতম সীমা নেই। তবুও তাদের ব্যয় বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হয়।
বিদেশি ব্যাংকগুলো ২০২৩ সালে সম্মিলিতভাবে চার হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। কিন্তু পরের বছর সিএসআরে মাত্র ২৫ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ ব্যয় করেছে। বিপরীতে আর্থিক সংকট সত্ত্বেও শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলো তাদের দুই হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার মুনাফার প্রায় ৯ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, স্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৪ দশমিক ২ শতাংশ অবদান রেখেছে, যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ঋণদাতারা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ ব্যয় করেছে।
নয়টি ব্যাংক ২০২৪ সালে সিএসআরে কোনো ব্যয় করেনি। তাদের বেশিরভাগই দীর্ঘমেয়াদে লোকসানে থাকা ব্যাংক। অন্যদিকে একটি নতুন ব্যাংকের ব্যয় করার মতো কোনো মুনাফা ছিল না।
অগ্রণী ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ছিল শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ। উরি ব্যাংক শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ ও সিটি ব্যাংক এনএ শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ ব্যয় করেছে। বিপরীতে মার্কেন্টাইল ব্যাংক তাদের লাভের ২১ শতাংশ, যমুনা ব্যাংক ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংক ১৫ দশমিক ২ শতাংশ ব্যয় করেছে।
আর্থিক দিক থেকে এক্সিম ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ৪৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক ৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ইসলামী ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৪২ কোটি টাকা করে ব্যয় করেছে।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১৬ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছে, যদিও কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে কষ্টে পড়েছিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এসব সমস্যা বাদ দিলেও স্থানীয় ব্যাংকগুলো কীভাবে সিএসআর প্রকল্প বেছে নেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাদের ব্যয় অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত। অনেক ব্যাংক তাদের বোর্ড সদস্যদের এলাকার সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পে অর্থায়ন করে। কিন্তু সিএসআরে শিক্ষার, স্বাস্থ্যসেবার ও পরিবেশের ওপর স্থায়ী প্রভাব থাকা প্রয়োজন।’
বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ২০১৪ সালে ভারত সিএসআর ব্যয় বাধ্যতামূলক করে। সেখানে সক্ষম কোম্পানিগুলোকে তাদের গড় নিট মুনাফার ২ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় করতে হয়। একই ধরনের নিয়ম ইন্দোনেশিয়া, মরিকাশাস ও ডেনমার্কেও আছে। আর যুক্তরাজ্য ও স্পেনের ক্ষেত্রে সিআরএস করপোরেট গভর্নেন্সের অংশ হিসেবে ধরা হয়।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০২৩ সালে সবচেয়ে লাভজনক ব্যাংক হলেও পরের বছর সামাজিক দায়বদ্ধতায় সবচেয়ে কম খরচকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ছিল। এই ব্যাংকের মুনাফা ছিল দুই হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু সিএসআর ব্যয় ছিল ২০ কোটি টাকার কম, যা মোট মুনাফার প্রায় শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ।
২০২৪ সালে এসসিবির মুনাফা বেড়ে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ব্যাংকটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সিএসআরে ৩৩ কোটি টাকা খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এরই মধ্যে তারা ৫ দশমিক ৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক জানিয়েছে, অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় তাদের সিএসআর খরচের পার্থক্য দায়িত্ববোধের অভাব থেকে হয়নি বরং এটি তাদের কৌশলগত বরাদ্দ পদ্ধতির ফল। এটি কয়েকটি নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, যেমনÑ ব্যয়ের চেয়ে প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া, পরিমাণের চেয়ে কৌশলগতভাবে বরাদ্দ বিবেচনা, সামগ্রিক মূল্য সৃষ্টি এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়ম মেনে চলা।
২০২৩ সালে ৯৯৯ কোটি টাকা নিয়ে মুনাফার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এইচএসবিসি বাংলাদেশ গত বছর সিএসআরে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ ব্যয় করেছে। এটি ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে এবং এরই মধ্যে প্রথম ছয় মাসে ১ দশমিক ৫৪ কোটি টাকা বিতরণ করেছে।
গত বছর ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয় আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে। মোট ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কমে ৬১৫ কোটি টাকায় নেমেছে, যা ২০২২ সালে রেকর্ড ১ হাজার ১৪২ কোটি টাকার পর দ্বিতীয় বার্ষিক পতন। মোট খরচের প্রায় অর্ধেকই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শীতকালীন সহায়তা এবং বন্যায় ত্রাণে ব্যবহার হয়েছে।
ব্যাংকগুলো আগের সরকারের অধীনে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলেও বড় অংকের অনুদান দেয়। কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন, এসব অনুদান রাজনৈতিক চাপের কারণে দেওয়া হয়েছিল।