শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব বিকাশে পেকুয়া মুক্ত স্কাউট গ্রুপের বার্ষিক গ্রুপ ক্যাম্প সম্পন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : মঙ্গলবার , ০২ জুন e ২০২৬

এস এম জুবায়ের পেকুয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:  তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ, মানবিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার অন্যতম সক্রিয় স্কাউট সংগঠন পেকুয়া মুক্ত স্কাউট গ্রুপের তিনদিনব্যাপী বার্ষিক গ্রুপ ক্যাম্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ মে থেকে ১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত পেকুয়া সরকারি মডেল জি.এম.সি. ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই ক্যাম্পে স্কাউটিংয়ের মৌলিক শিক্ষা থেকে শুরু করে নেতৃত্ব বিকাশ, প্রাথমিক চিকিৎসা, দড়ির কাজ, প্রজেক্ট নির্মাণ, হাইকিং এবং ক্যাম্প ফায়ারসহ বিভিন্ন বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

 

আয়োজক সূত্রে জানা যায়, বার্ষিক এই ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী স্কাউট সদস্যরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানই অর্জন করেনি, বরং দলগত জীবন, আত্মনির্ভরশীলতা, দায়িত্ববোধ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং সংকট মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাও হাতে-কলমে শিখেছে। স্কাউটিংয়ের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী সদস্যদের চরিত্র গঠন, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পের প্রতিটি কার্যক্রম সাজানো হয়।

 

ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পেকুয়া মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল মোস্তফার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ সভাপতি জাকের আহমদ। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, "বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অতি ব্যবহারে তরুণদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। স্কাউটিং এমন একটি আন্দোলন, যা তরুণদের নৈতিকতা, মানবিকতা, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।"

 

তিনি আরও বলেন, স্কাউটিং শুধু একটি সহ-শিক্ষা কার্যক্রম নয়; এটি একটি জীবনদর্শন, যা একজন কিশোর-তরুণকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ক্যাম্প ফায়ার অনুষ্ঠান ছিল পুরো ক্যাম্পের অন্যতম আকর্ষণ। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পেকুয়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামরান জাদিদ মুকুট। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ কমিটির সদস্যবৃন্দ, অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

 

ক্যাম্প ফায়ারে স্কাউট সদস্যরা দেশাত্মবোধক গান, লোকসংগীত, নাটিকা, দলীয় পরিবেশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। আগুনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী এই অনুষ্ঠান অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, দলীয় চেতনা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

ক্যাম্পের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত সনদপত্র বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মুজিবুর রহমান।

 

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারি সিটি কলেজ চট্টগ্রামের প্রভাষক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিয়াদ ইসলাম এবং নুর-আয়েশা খাঁন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এম. ইসমাইল খাঁন।

 

অতিথিরা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, স্কাউটিং তরুণদের মধ্যে নেতৃত্ব, সততা, দায়িত্ববোধ ও সেবার মনোভাব গড়ে তোলে। একটি উন্নত, সচেতন ও মানবিক সমাজ গঠনে স্কাউট আন্দোলনের অবদান অপরিসীম।

 

তিনদিনব্যাপী এই ক্যাম্পে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খাগড়াছড়ির রামগড় সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. বোরহান উদ্দিন (পিআরএস), চট্টগ্রামের স্বপ্নীল মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সভাপতি লাবীব মোহাম্মদ তক্কী (পিআরএস, উডব্যাজার), ইউনিট লিডার রোকন উদ্দিন ওয়ারেসী (পিআরএস) এবং পারকী মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সম্পাদক মো. মনজুরুল কবির।

 

তাঁদের পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীরা স্কাউট আন্দোলনের মৌলিক বিষয় ও ইতিহাস, বাংলাদেশ স্কাউটস এবং বিশ্ব স্কাউট সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো, উপদলীয় কার্যক্রম, নেতৃত্ব বিকাশ, ব্যাজ পদ্ধতি, স্কাউটিং ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, কিমস গেম, বনকলা, স্কাউট ওন এবং ট্রুপ মিটিংয়ের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।

 

ক্যাম্পে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সদস্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়, দড়ির বিভিন্ন গিঁট ও বাঁধন, ল্যাশিং, ক্যাম্প স্থাপন, প্রজেক্ট নির্মাণ, অনুমান ও পর্যবেক্ষণ, কোড, সংকেত ও সাইফারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তব অনুশীলনে অংশ নেয়।

 

প্রশিক্ষকরা জানান, বর্তমান সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার কার্যক্রম এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে এসব দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কাউট সদস্যরা এসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের পাশাপাশি সমাজেরও উপকারে আসতে পারবে।

 

ক্যাম্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আয়োজনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল পাহাড়ি এলাকায় হাইকিং কার্যক্রম। হাইকিংয়ের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভের পাশাপাশি সহনশীলতা, দলগত সমন্বয় এবং নেতৃত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

 

অংশগ্রহণকারী স্কাউট সদস্যরা জানান, ক্যাম্পের প্রতিটি কার্যক্রম তাদের নতুন কিছু শিখতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে হাইকিং, ক্যাম্প ফায়ার এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য ও শিক্ষণীয় ছিল।

 

পেকুয়া মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সম্পাদক মো. আরকানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ক্যাম্পটি বাস্তবায়িত হয়। ক্যাম্পের বিভিন্ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইউনিট লিডার আইরিন সুলতানা উর্মি, আহমদ নুর ও সালাহ উদ্দিন। 

 

আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও তরুণদের নৈতিক, মানসিক ও শারীরিক বিকাশে স্কাউটিং কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে এবং পেকুয়া অঞ্চলে দক্ষ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ক্যাম্প আয়োজন অব্যাহত থাকবে।


আর্কাইভ