টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত খুলনাঞ্চলের সবজি ক্ষেত: দামে বিপাকে ক্রেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মঙ্গলবার , ০৪ আগষ্ট ২০২৬

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যার ফলে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে দাম প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটার মতো প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো থেকে সবজি পরিবহনের খরচ প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। একটানা বৃষ্টির পানি জমে নিচু জমির লাউ, শসা, করলা, বেগুন ও মরিচের ক্ষেত সম্পূর্ণ পচে গেছে। বৃষ্টির কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় এবং শ্রমিক সংকট তৈরি হওয়ায় সবজি পরিবহনের খরচ প্রায় ৫০% বেড়েছে।

খুলনার কাঁচা বাজারে অতি বৃষ্টির অজুহাতে বেগুন, কাঁচামরিচসহ সবজির দাম মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। খুলনার স্থানীয় বিভিন্ন বাজার রূপসা বাজার, সন্ধ্যা বাজার, টুটপাড়া কবরখানা বাজার ও ময়লাপোতা মোড় সংলগ্ন সন্ধ্যা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষা ও অতি বৃষ্টির কারণে সরবরাহ সংকটের কথা বলে বিক্রেতারা সব ধরণের সবজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। একই চিত্র সাতক্ষীরা, যশোর, নড়ইল ও বাগেরহাটের। এতে সাধারণ ক্রেতাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। 

সূত্রমতে, কাঁচামরিচ আগের দাম ১২০-১৫০ টাকা যা বর্তমানে ২৬০-৩০০ টাকা। বেগুন আগের দাম ৫০-৬০ টাকা বর্তমানে ১০০-১২০ টাকা। করল্লা আগের দাম ৬০-৭০ টাকা যা বর্তমানে ১২০ - ১৩০ টাকা। টমেটো আগের দাম ১৪০-১৫০ টাকা যা বর্তমানে ২৬০-২৮০ টাকা। ঢেঁড়স/পটল আগের দাম ৪০-৫০ টাকা যা বর্তমানে ৮০-৯০ টাকা। 

বিক্রেতাদের দাবি টানা বৃষ্টির কারণে পাইকারি মোকামগুলোতেই সবজির সংকট দেখা দিয়েছে। আড়ত থেকে চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে বিধায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। 

সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও মাত্র ২-৩ দিনের ব্যবধানে দাম দ্বিগুণ হওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের আয় বাড়েনি। ফলে প্রয়োজনীয় বাজার করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। একজন ক্রেতা বলেন, সবজি কিনতেই পকেটের অধিকাংশ টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর মুদি সামগ্রী কেনার মতো অর্থ আর থাকে না। নিয়মিত বাজার মনিটরিং না থাকায় বিক্রেতারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। খুলনার জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যদি দ্রুত বাজার মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা না করে, তবে এই সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে বলে সাধারণ ক্রেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। 

গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিক অতি বৃষ্টিতে খুলনা বিভাগের চার জেলায় আট হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকের নানা ধরনের সবজি মাঠেই পচেছে। এসব জেলায় ৩৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হচ্ছে, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইল।

ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে তেরখাদা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দিঘলিয়া, দাকোপ, বাগেরহাটের সদর, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, চিতলমারী, নড়াইল সদর, লোহাগড়া, কালিয়া ও সাতক্ষীরা জেলা সদর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী তরমুজ, কাঁচামরিচ, পান, ঢেড়স, পুঁইশাক, ঝিঙে, উচ্ছে, বেগুন ও করোলা সবজি ক্ষেতেই পচেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, এসব জেলায় ১৩ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফসলের মধ্যে ৩৮৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষেতে পচে যাওয়া ফসলের মূল্য ৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। খুলনাঞ্চলে হাজার হাজার মহাজন চাষী, বর্গা, প্রান্তিক চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্রাবণের শুরুতে অতিবৃষ্টির ফলে দিনমজুরদের পারিশ্রমিকের মজুরীও বেড়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষ সবজির দাম ১৫-২০ টাকা কেজিতে বেড়েছে। ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা থেকে সবজিবাহী ভ্যান ও ট্রলির ভাড়ার পরিমাণ দেড়গুণ বেড়েছে। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বল্প মূল্যে বেগুন, পটলসহ অন্যান্য সবজি বিক্রি করেছে। অতিবৃষ্টির কারণে শীতের সীম, লাউ, টমেটো বাজার আসতে বিলম্ব হবে।


আর্কাইভ