মাটির গবেষণায় দুর্নীতির বীজ: ডিজি আফসার আলীর সিন্ডিকেটে জিম্মি প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক : রবিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর ber ২০২৬

নূরে আলম: দেশের কৃষি খাতের সুরক্ষায় নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে (এসআরডিআই) চরম দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, নথিপত্র গায়েব এবং চাকুরির বিধিমালা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) ড. আফসার আলী এবং তার ঘনিষ্ঠ একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই বিশৃঙ্খলা ও তোষণ নীতির অভিযোগ এনেছেন ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।


​প্রাপ্ত অভিযোগে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার বদলে বিগত আওয়ামী শাসনের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে প্রধান কার্যালয়কে।


এর আগে কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের অধীন ‘Accreditation Lab’-এর কোয়ালিটি ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ড. লুৎফর রহমান এবং টেকনিক্যাল ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী।আওয়ামী আমলে এই দুইজন কর্মকর্তা Accreditation Lab’ এর দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে ল্যাব প্রতিষ্ঠা না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে 'মৃত্তিকা গবেষণা এবং গবেষণা সুবিধা জোরদারকরণ” শীর্ষক (SRSRF) প্রকল্পের  "Accreditation Lab’ প্রতিষ্ঠার জন্য যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে ওই চক্র। অনেক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পর থেকেই নষ্ট ও অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে যা সরজমিনে গিয়ে প্রমাণ মেলে । শুধু যন্ত্রপাতি ক্রয় নয়, এক ভারতীয় কনসালট্যান্টকে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠে।ঐ ভারতীয় কনসালটেন্ট কোন রিপোর্ট বা সনদপত্র হস্তান্তর না করা সত্ত্বেও লুৎফর - সিরাজী চক্র টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী নেতা ড.লুৎফর - ড.সিরাজী চক্র ঢাকার বাহিরে বদলির সময় দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় দুর্নীতির প্রমাণ নষ্ট করতে ফাইলের মূল কাগজপত্র গায়েব করার মতো গুরুতর অপরাধ করেন তিনি, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ।
গত বছরের  ১৯শে অক্টোবর কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের  সিএসও মো:জয়নাল আবেদিনের স্বাক্ষরিত একটি চিটিতে ৮টি নথি না পাওয়ায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।


নথিপত্র গায়েবের বিষয় নিয়ে ড.সিরাজীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন আমি মো:জয়নাল আবেদীনের কাছে এক্রেডিটেশন ল্যাবের সকল নথিপথ বুঝিয়ে দিয়েছি যার রিসিভ কপি আমার কাছে আছে।পক্ষান্তরে মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পালটা অভিযোগ করে বলেন ড.সিরাজীর ফাইলে কোন প্রকার নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলেই তাকে শোকজ করা হয়েছিলো।


নিম্নমানের ও অকেজো  যন্ত্রপাতির ব্যপারে ড.সিরাজী বলেন এই সকল যন্ত্রপাতি সবাই ব্যবহার করতে পারেনা বলে ব্যবহার না করায় নস্ট হয়ে আছে।

ড. সিরাজী একজন আওয়ামী নেতা হিসেবে চাকরি শুরু থেকে টানা ১৮ বছর ঢাকায় পদায়ন নিয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রূপে কাজ করে পুরস্কার স্বরূপ 'নবসৃষ্ট তিনটি গবেষণাগার জোরদারকরণ কর্মসূচির' প্রকল্প পরিচালক বনে যান। ওই প্রকল্পের যন্ত্রপাতি কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


এত বড় অপরাধ করার পরেও শাস্তি দেওয়ার বদলে বর্তমান ডিজি ড.আফসার আলী, সিরাজীকে ঢাকায় এনে সয়েল কেমিস্ট্রি শাখার 'Accreditation Lab’ এবং সয়েল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের এক্রিডিটেশনের নতুন করে দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন।


কাজ না করেই অর্থ লোপাটের ব্যাপারে জানতে ড.হুমায়ন কবির সিরাজী বলেন এইটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

​পরিকল্পনা সেল ভাঙন ও যোগ্য কর্মকর্তাদের হয়রানি:
​দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নে নিয়োজিত ‘পরিকল্পনা সেল’-কে সুকৌশলে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অলিখিত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিপিসি কমিটিতে  ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাঈমুল ইসলাম কে অপসারণ করে  ফ্যাসিস্ট, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মামুনুর রহমানকে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি গঠন করে ড.আফসার আলী। উল্লেখ্য, এর আগে মামুনুর রহমান এই কমিটি থেকে অব্যাহতি নিলেও তাকেই আবার নতুন করে ডিপিসি কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

​৯ম গ্রেডের পাবলিকেশন ও লিয়াজো কর্মকর্তার ‘পাজেরো রাজত্ব’:
​পাবলিকেশন অ্যান্ড লিয়াজোঁ অফিসার (৯ম গ্রেড) জনাব শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিয়ম বহির্ভূতভাবে একটি বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৭৮৪৬) ব্যবহার করছেন তিনি। নিয়োগবিধিতে আছে, 'সহকারী পরিচালক হিসেবে ৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে তাকে  উপপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া যাবে।' কিন্তু জনাব শরিফুল ইসলামের ওই যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও উপ-পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে রুটিন দায়িত্ব পালনকারী বিএনপিপন্থী ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন নারী কর্মকর্তাকে কোন কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দিয়ে শরিফুল ইসলামকে সম্প্রতি বিধি লঙ্ঘন করে ‘উপ-পরিচালক (প্রশাসন)’ এর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 
এই ব্যপারে  শরিফুল বলেন আমাকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।পদোন্নতিতো দেয়নি আর উপ-পরিচালক(প্রশাসন)পদটি আমি দীর্ঘদিন কাজ করেই সৃষ্টি করেছি।


​ডিজির রাজকীয় বিলাসিতা ও বৈষম্য:
​মহাপরিচালক ড. আফসার আলী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সৎ ও বিরোধী মতাদর্শী একাধিক কর্মকর্তার অফিশিয়াল গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ তিনি নিজেও তার পরিবার সরকারি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ৩টি গাড়ি এককভাবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ আসে। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪র্থ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ঢাকা অফিসে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ন্যস্ত করার অভিযোগও রয়েছে ডিজি আফসারের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৪র্থ গ্রেডের মো: আমিনুল ইসলামকে অবৈধভাবে ঢাকায় ন্যস্ত করা হয়েছে।

 

​বিতর্কিত কমিটি ও ৬৩ কর্মচারীর চাকুরী অনিশ্চয়তা :

​ইনস্টিটিউটের কারিগরি রিপোর্ট প্রকাশের জন্য গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিতর্কিত কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদকে। পাশাপাশি, কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া ৬৩ জন আউটসোর্সিং স্টাফের ২ বছর মেয়াদি চুক্তি হঠাৎ বাতিল করা হয়েছে। ফলে একদিকে এই নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে, অন্যদিকে অনেকে কর্মচারী বেতন না পেয়ে কর্মস্থলে না আসায় এসআরডিআই-এর ল্যাব ও মাঠ জরিপের কাজ অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। মাহমুদুল হাসান নামে এক কর্মচারী  বলেন আমরা যেই কোম্পানীর মাধ্যমে চাকুরী পেয়েছিলাম তার চুক্তি বাতিল হওয়ায় এবং নতুন কোন কোম্পানীর সাথে চুক্তি না হওয়ার ফলে গত ৩মাস কোন বেতন পাচ্ছিনা।যার ফলে আমাকে বর্তমানে ঋণ করে চলতে হচ্ছে।
এইদিকে কৃষিবিদ সিকিউরিটি সার্ভিস লি: এর মালিক জনাব ফেরদৌস বলেন ২০২৫ সালের নীতিমালা হিসেবে সাবেক মহাপরিচালক ২বছরের চুক্তি করেন আমার প্রতিষ্ঠানের সাথে।কিন্তু বর্তমান মহাপরিচালক এসে তা বাতিল করেন।এবং বাতিলের পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও নতুন করে কোন টেন্ডার আহবান করছেনা।এতে ৬৩জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে।
 অভিযোগ উঠেছে বর্তমান  মহাপরিচালক নতুন কোন কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্যই  পুরাতন প্রতিষ্ঠানের চুক্তিবাতিল করেছে।

 

অহেতুক হয়রানি বদলি আতঙ্ক:  প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একটি আতঙ্ক বিরাজ করছে যে ডিজি আফসার আলী কোন কারন ছাড়াই ভিন্নমতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অহেতুক বদলি করছেন। সম্প্রতি ঢাকার বাইরের কর্মকর্তা এবং স্টাফদেরকে দূরবর্তী স্থানে হয়রানি মূলক স্টেশনে  বদলি করছেন। তিনি বদলি করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না বিনা কারণে স্ট্যান্ড রিলিজ করছেন। এতে প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

নিয়ম-বহির্ভুতভাবে পদোন্নতির তোড়জোড়:
নিয়োগ এবং পদোন্নতিতে আদালতের Stay আদেশের বিরুদ্ধে নন-ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা আপিল করলে (সিপিএলএ ৫০৯৮/২০২৫) মহামান্য আপিল বিভাগ সে মামলাটিও ১৯/০৪/২৬ তারিখে লিভ টু আপিলের আদেশ প্রদান করেন। এছাড়া সিনিয়রিটি নিয়ে ১৯৭৩৫/২০২৫ নং আরও একটি মামলার রুল দেওয়া আছে। বিধায় প্রমোশন দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও ০৮জন নন-ক্যাডার,১২জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে বলে অভিযোগ উঠে।

সামগ্রিক বিষয় নিয়ে জানতে মহাপরিচালক ড.আফসার আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আমরা আউটসোর্সিং এর ব্যপারে খুব দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে,গত ডিজি অবৈধভাবে ২বছর চুক্তি করায় তা বাতিল করা হয়েছিলো।
অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ড.সিরাজী কে ঢাকায় বদলির ব্যপারে তিনি বলেন,কাজের প্রয়োজনে তাকে প্রধান কার্যালয়ে আনা হয়েছে।প্রতিষ্ঠান চাইলে যে কাউকেই প্রধান কার্যালয়ে আনতে পারে।মহাপরিচালকের একাধিক গাড়ির ব্যপারে তিনি বলেন,একটা গাড়ি যেইটা শুধুমাত্র মন্ত্রণালয়ের পাশ নেওয়া আছে তাই ঐটা দিয়ে শুধু মন্ত্রণালয়ে যাই।অন্যান্য গাড়ির ব্যপারে বলেন গাড়ি পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যায় তাই মাঝে মাঝে অন্যান্য গাড়ি ব্যবহার করি সচল রাখার জন্যে।


আর্কাইভ