সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতিতে মিলছে না রুট পারমিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : সোমবার , ০২ নভেম্বর ২০২৬

২০২৬ সালের নতুন পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার থেকে প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটক ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছে সরকার।সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতিতে এখনো কোনো পর্যটকবাহী জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ফলে মৌসুম শুরু হলেও সেন্ট মার্টিনে পর্যটক পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।জানা গেছে, কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচলের জন্য সাতটি পর্যটকবাহী জাহাজের মালিকপক্ষ রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদনের আবেদন করেছে। তবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দেওয়ায় কোনো জাহাজেরই অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।এর মধ্যে তিনটি জাহাজের অনুকূলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে বিআইডব্লিউটিএ রুট পারমিট দিতে পারছে না। অন্য চারটি জাহাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সম্মতি চাওয়ার প্রক্রিয়াও আটকে রয়েছে।সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি রয়েছে।প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনুমোদিত জাহাজগুলো কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে চলাচল করবে।প্রথম দিকে নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখার নির্দেশনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো মৌসুমেই পর্যটকদের দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক সালমা আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাহাজগুলোর আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।চিঠি অনুযায়ী, এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বারো আউলিয়া ও এমভি টেকনাফের মালিকপক্ষ গত ৬ ও ৭ অক্টোবর রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদনের আবেদন করে। এসব জাহাজের অনুকূলে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দেওয়ায় অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।অন্যদিকে এমভি কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, এমভি কেয়ারি সিন্দাবাদ, এলসিটি কাজল ও এমভি বে-কুইজার-১ নামের চারটি জাহাজের মালিকপক্ষ গত ২৬ ও ২৭ অক্টোবর আবেদন করে। কিন্তু এসব জাহাজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে নীতিগত সম্মতি চেয়ে চিঠি পাঠানোও সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ সাতটি জাহাজের কোনোটিরই রুট পারমিট ও চলাচলের সময়সূচি এখনো অনুমোদিত হয়নি।বিআইডব্লিউটিএর চিঠিতে সাতটি জাহাজের মালিকপক্ষকে হালনাগাদ সার্ভে সার্টিফিকেট, রুট পারমিট ফি জমার প্রমাণ, কোস্টগার্ডের ছাড়পত্র, ভয়েজ লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এসব কাগজপত্র পাওয়ার পরই পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।এদিকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের সময়সীমা, দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা এবং জাহাজ ছাড়ার স্থান নির্ধারণে গত ১২ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পর্যটক যাতায়াতের বর্তমান সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। রাত্রিযাপনের সময়সীমা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত নির্দেশনাও জারি করা হয়।তবে দ্বীপে পর্যটক পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে।বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত নৌপথের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।এত দীর্ঘ সামুদ্রিক পথে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে জাহাজের হালনাগাদ সার্ভে সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় নৌ-সংক্রান্ত কাগজপত্র থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন সমুদ্রে চলাচল না করা জাহাজগুলোর নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে এসব সনদ যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনীয় নথি ছাড়া কোনো জাহাজকে রুট পারমিট দেওয়ার সুযোগ নেই। যেসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দেবে, তাদের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।অন্যদিকে জাহাজ মালিক ও ট্যুর অপারেটররা বলছেন, গত ২৭ অক্টোবর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় জাহাজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ ও জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লেগেছে। তবে বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথিপত্র দ্রুত জমা দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।তাদের দাবি, আগামী শুক্রবারের মধ্যে পর্যটকবাহী জাহাজ নিয়ে সেন্ট মার্টিনে যাত্রা শুরু করতে ট্যুর অপারেটরদের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও জাহাজ চলাচলের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে নতুন পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি সেন্ট মার্টিনের পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের আয়ের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


আর্কাইভ