বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: বোরো মৌসুমের কৃষিতে ধানের বাম্পার ফলন পাওয়ার সম্ভাবনায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ভোরের আলো ফুটতেই কোদাল, পাঁচন, দড়ি ও ধানের চারা নিয়ে মাঠে নেমে পড়ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। মাঠে মাঠে এখন ইরি-বোরো ধান ক্ষেত পরিচর্যা ও সার প্রয়োগে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইরি-বোরো ক্ষেতে সময় দিচ্ছেন তারা।
এ অঞ্চলে ইরি-বোরো ধানের চারা রোপণের কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন এ অঞ্চলের মাঠের পর মাঠ, যে দিকে চোখ যায়, সে দিকে দেখা যাচ্ছে কচি সবুজ, উঠতি বয়সের ইরি-বোরো ধানের চারা। তাই এ অঞ্চলের কৃষকরা বুকে রঙ্গিন স্বপ্ন ধারণ করে ইরি-বোরো ধানের ক্ষেতে কাজ করছেন।
সরেজমিন দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন মাঠে দেখা যায়, কৃষকরা কেউ সার-কীটনাশক প্রয়োগ করছেন, কেউবা আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ আবার জমিতে পানি সেচের কাজে ব্যস্ত। এই দৃশ্য দেখে মনে হলো, কৃষকদের কাঙ্খিত ফসল ভালোভাবে ফলাতে দম ফেলানোর সময় নেই তাদের। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সঠিক সময়ে বীজতলা তৈরি করতে পারায় ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেচ পাম্পে যদি সময় মতো বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে পানির অভাবে বাম্পার ফলনে বড় হুমকি হতে পারে।
এদিকে উপকুলীয়াঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি চাষীরা এবার ঝুঁকেছে ইরি বোরো চাষে। পুঁজি সংকট, ভাইরাস ও দাবদাহে চিংড়ির মড়কের কারণে তাদের এই পেশা পরিবর্তন। উপকুলের ১১টি উপজেলায় প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে না। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে এবার ইরি বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে। নতুন উদ্দীপনায় কৃষান কৃষানী কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছে।
শুরু হয়ে গেছে ইরি-বোরো আবাদ। উঠতি আগাম আমন ফসলী জমিতে ধানের পাতা রোপন করেছে কৃষক। তাদের চোখে মুখে আগামীর স্বপ্ন ঝিলিক দিচ্ছে ভোরের সূর্যের রশ্মির মত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গতবছর ধান ও চালের দাম ভালো পাওয়ায় অনেক প্রান্তিক ও বর্গাচাষি এবছর ইরি-বোরো চাষে ঝুঁকে পড়য়েছেন বলে আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা গেছে।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বিরাট গ্রামের বিকারুল হালদার বিকা বলেন, আমি প্রায় ৩ বিঘা জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করিছি। ধানের জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করা শেষ হয়েছে। এখন ধান ক্ষেতে সার প্রয়োগ করছি। চারা গাছের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে এবার ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে। তবে, পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের পানি কম উঠছে। এতে একটু সমস্যা হচ্ছে। তারপরেও ভালো ফলন হবে ইনশাআল্লাহ।
বাগেরহাটের বেতাগা গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন- বেতাগা গ্রামের মাঠে কিছু কিছু জমিতে আগে ইরি-বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। এখন চারার আগাছা পরিষ্কার শেষ করে সার প্রয়োগের কাজ চলছে। তিনি বলেন, আমাদের এই সোনালী ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত ব্যস্ততা থাকবে।
সাতক্ষীরার তালা গ্রামের কৃষক রমজান বলেন, আমরা সাধারণত কৃষির ওপর নীর্ভরশীল, তাই এই ইরি-বোরো আবাদের পুরো সময় আমাদের ভালো ফলনের আশায় পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকতে হয়।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তথ্য মতে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে এ অঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের ধান জমিতে রোপণ করেছেন কৃষকরা। এজন্য ভালো ফলনসহ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হবে এটায় আশা করছি। কৃষকরা মন-প্রাণ দিয়ে জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষ করছেন এবং নিয়মিতভাবে তারা পরিচর্যার কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন। যাতে প্রাকৃতিকভাবে কোনো ক্ষতি হওয়ার আগে তারা ফসল ঘরে তুলতে পারেন।
খুলনা আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে বলা হয়, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে ইরি-বোরো ধান চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ, পরামর্শ, উঠান বৈঠক, নতুন নতুন জাতের বীজ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক বোরো চাষ সম্পন্নের লক্ষ্যে সহজশর্তে কৃষকদের লোন প্রদান করছে। বাজারে বর্তমানে ধান ও চালের দাম বৃদ্ধি থাকায় এ অঞ্চলের জেলাগুলোতে ইরি-বোরোর চাষ দিন দিন বাড়ছে বলে তিনি জানান।
সূত্রমতে, উপকুলীয়াঞ্চল খুলনা সাতক্ষীরা বাগেরহাটের ১১টি উপজেলায় লবণ পানি তুলতে না পারায় অনেক চাষি চিংড়ি চাষ করতে পারছে না। আবার অনেকে স্বেচ্ছায় চিংড়ি চাষ ছেড়ে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করছে। কয়েকটি নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় লবণ পানি পাচ্ছে না চাষিরা। এছাড়া চিংড়ি ঘেরের বেশ কিছু জমিতে ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। সে কারণে কমেছে চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ।
কয়রা উপজেলার বাগালী, আমাদী, মহারাজপুর, উত্তর বেদকাশীসহ কয়েকটি এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা উৎসাহ নিয়ে বীজ তলা থেকে পাতা উঠিয়ে জমিতে রোপন করছে। এখন পরিচর্যায় ব্যস্ত তারা। যেন উৎসবে মেতেছেন।