শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পে অবহেলা ও অনিয়ম কেডিএ’র ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : মঙ্গলবার , ১৫ সেপ্টেম্বর ber ২০২৬

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:
খুলনার বহুল আলোচিত শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা, চরম অবহেলা ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ চললেও এর সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা। প্রায় ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। নির্ধারিত সময়ের অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি, অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭০ কোটি টাকার বেশি বিল তুলে নিয়েছে। পিচ ঢালাই দেওয়ার পরপরই তা উঠে যাওয়ার মতো নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি বর্তমানে বেহাল দশা, খানাখন্দ ও কাদায় ভরা থাকায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে এবং ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। 

এদিকে, খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম দীর্ঘসূত্রতা, অবহেলা ও আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মেলায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) সাবেক ও বর্তমান ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

গত ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক শাখা-৩-এর সচিব দীপক কুমার রায় স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কেডিএ চেয়ারম্যানকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি বা বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত জানাতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাস্তবায়ন শুরু হওয়া এই প্রকল্পে কোনো প্রাথমিক সমীক্ষা ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়ন, বছরের পর বছর দীর্ঘসূত্রতা এবং জিওবি তহবিল থেকে কেডিএর নিজস্ব তহবিলে ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা স্থানান্তরের মতো একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ তদন্তে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা ও গাফিলতির বিষয়টি শতভাগ প্রমাণিত হয়।

অভিযুক্ত ১১ জনের মধ্যে কেডিএ’র বিভিন্ন পর্যায়ের ৬ জন প্রকৌশলী ও ৫ জন হিসাব বিভাগের কর্মী রয়েছেন। তারা হলেন প্রকৌশলীবৃন্দ: সহকারী প্রকৌশলী ও বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. আরমান হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প) ও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মুজিবুর রহমান, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী এটিএম ওয়াহিদ আজহার, উপ-প্রকল্প পরিচালক ও বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী (রক্ষণাবেক্ষণ) মুনতাসির মামুন এবং অবসরপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ। এছাড়া ক্যাশিয়ার মেহেদী হাসান, সহকারী হিসাবরক্ষক (অবসরপ্রাপ্ত) পলাশ কুমার ঘোষ, হিসাবরক্ষক (পূর্ত) শাহানা আক্তার, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইদুল হক এবং অবসরপ্রাপ্ত অর্থ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এম এম হোসেন আলী। কেডিএ চেয়ারম্যান এড. শফিকুল আলম মনা জানান, মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

২০১৩ সালের ৭ মে একনেকে খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়, যার প্রাথমিক বাজেট ছিল ৯৮ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২০ সালে প্রথম দফায় সংশোধন এনে ব্যয় বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি টাকা করা হয়।

পরবর্তীকালে চলতি বছরের ৯ জুন একনেক সভায় প্রকল্পের বরাদ্দ আরও ২৮০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বর্ধিত বরাদ্দের প্রস্তাবটি ফেরত পাঠিয়ে দায়ীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

ইতোপূর্বে ধীরগতির কারণে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মাহাবুব ব্রাদার্স’-এর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে কেডিএ। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় বর্তমানে সড়কটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, যা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


আর্কাইভ