সাব্বির হোসাইন আজিজ, মাদারীপুরঃ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সবার আশা ছিল চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে আবার প্রিয়জনরা ফিরবেন নিজ গৃহে। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠলো জীবনের শেষ পথচলা। তবে সুস্থর পরিবর্তে গৃহে ফিরলেন লাশ হয়ে। ফরিদপুরের নগরকান্দায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে নিহত হন মাদারীপুরের একই পরিবারের চারজনসহ মোট পাঁচজন। এ ঘটনায় সদর উপজেলার বালিয়া গ্রামে চলছে এখন শুধুই কান্না, আহাজারি আর শোকের মাতম। রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় ঢাকাগামী একটি বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের আলমগীর মোল্লা (৫৫), তার স্ত্রী খুশি বেগম (৩৬), বড় ভাই জাহাঙ্গীর মোল্লা (৬৫), ভাবি বেলী বেগম (৪০) এবং অ্যাম্বুলেন্স চালক কাওসার মাতুব্বর।
স্বজনরা জানান, প্রায় দুই মাস আগে আলমগীর মোল্লা প্যারালাইজডে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরলেও রোববার সকালে হঠাৎ তার অবস্থার অবনতি হয়। একারনে চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে যায় সবকিছু। ফরিদপুরের শংকরপাশা এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় অ্যাম্বুলেন্সটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পাঁচজন।
রোববার বিকেল ৪টার দিকে নিহতদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে মস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে নেমে আসে হৃদয়বিদারক পরিবেশ। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন, কেউ আবার হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন প্রিয়জনদের নিথর দেহের দিকে।
দুই সন্তান ও দুই পুত্রবধূকে হারিয়ে আহাজারি করছিলেন বৃদ্ধ পিতা হাজী ওয়াহেদ আলী মোল্লা। বুকফাটা কান্নায় তিনি বলেন, “শেষ বয়সে আমি আমার দুই সন্তান ও দুই ছেলের বউকে হারালাম। এই শোক আমি কিভাবে সইবো? আমার এক ছেলে অসুস্থ ছিল, সেই অসুস্থ ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে পুরো পরিবারটাই হারিয়ে ফেললাম। ডাক্তার দেখিয়ে ওদের সুস্থ হয়ে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু ওরা ফিরল লাশ হয়ে।
প্রতিবেশীরা জানান, “সকালে যারা চিকিৎসার জন্য বের হয়েছিল, বিকেলে তারা লাশ হয়ে ফিরবে- এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। পুরো গ্রাম আজ স্তব্ধ।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবারটি ছিল অত্যন্ত শান্ত ও সবার সঙ্গে মিশুক। একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুতে পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের ছোট ছোট সন্তান ও স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বজনরা বিআরটিসি বাসচালকের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করার দাবিও জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, “ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। একটি পরিবারের এতগুলো প্রাণ একসঙ্গে ঝরে যাওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে প্রশাসন রয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”